বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:৫৮:৩০

যে বড় পরিবর্তন আসছে সরকারি চাকরির পদোন্নতিতে

যে বড় পরিবর্তন আসছে সরকারি চাকরির পদোন্নতিতে

এমটিনিউজ২৪ ডেস্ক : নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করছে সরকার। প্রস্তাবিত বিধিমালায় পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনের পরও কেউ পদোন্নতি নিতে না চাইলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করার বিধান রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

খসড়া বিধিমালায় বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনের (এসিআর) গড় নম্বরের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মানদণ্ড রাখা হয়েছে। পদোন্নতির জন্য বিগত পাঁচ বছর অথবা ফিডার পদে চাকরিকালের মধ্যে যেটি কম, সেই সময়ের ন্যূনতম গড় নম্বর ৮০ থাকতে হবে। গড় নম্বর ৬৯-এর নিচে হলে তা বিরূপ মন্তব্য হিসেবে গণ্য হবে। তবে অবসরোত্তর ছুটি ভোগরত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি পাবেন না।

প্রস্তাবিত বিধিমালা অনুযায়ী, পদোন্নতিযোগ্য শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতি দেওয়া যাবে। তবে লিয়েন বা চলতি দায়িত্বের কারণে সৃষ্ট শূন্য পদে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদোন্নতি দেওয়া যাবে না।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিধি) মো. মোস্তফা জামান যুগান্তরকে বলেন, সরকার ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি বিধিমালা প্রণয়নে কাজ শুরু করেছে। এখনো কাজ চলছে। একটি খসড়া তৈরি করে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হচ্ছে। নতুন বিধিমালায় কী ধরনের পরিবর্তন আসছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু নতুন বিধি সংযোজন হবেই। তবে বিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়।

যেভাবে নির্ধারণ হবে জ্যেষ্ঠতা

খসড়া বিধিমালার শুরুতেই বলা হয়েছে, এর বিধান সব নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে। পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আগে নিয়োগপ্রাপ্তরা পরে একই পদ্ধতিতে নিয়োগপ্রাপ্তদের চেয়ে জ্যেষ্ঠতা পাবেন।

উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দুই বা ততোধিক ব্যক্তিকে কোনো কমিটি বা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হলে তাদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা কমিটি বা কমিশনের তৈরি মেধাতালিকার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। মেধাতালিকা না থাকলে বা পাওয়া না গেলে বয়সের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে। বয়সও একই হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের শিক্ষাবর্ষ, এরপর ফলাফলের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে।

সমন্বিত জ্যেষ্ঠতার ক্ষেত্রে পদোন্নতিযোগ্য পদের ফিডার পদে নিয়মিত যোগদানের তারিখকে ভিত্তি ধরা হবে। যোগদানের তারিখ একই হলে বয়স, বয়সও একই হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের শিক্ষাবর্ষ এবং এরপর ফলাফলের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি ফিডার পদের মেধাক্রমও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

মামলা ও দণ্ড থাকলে পদোন্নতি নয়

বিচারাধীন ও দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির ক্ষেত্রেও নতুন বিধান রাখা হয়েছে। কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় অভিযোগনামা দাখিল, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় চার্জশিট দাখিল, ফৌজদারি মামলা দায়েরের সরকারি অনুমোদন দেওয়া বা গ্রেফতার হলে মামলা চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি পদোন্নতি পাবেন না।

কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর লঘুদণ্ডের মেয়াদ এক বছর এবং গুরুদণ্ডের মেয়াদ দুই বছর হলে, দণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও দুই বছর পর্যন্ত তিনি পদোন্নতি পাবেন না।

তবে বিভাগীয় মামলা, দুদকের মামলা বা ফৌজদারি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেলে পদ শূন্য থাকা সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি পাবেন। একই সঙ্গে তিনি ধারণাগত জ্যেষ্ঠতাও পাবেন।

কমিটি বা কমিশনের সুপারিশে পদোন্নতি

খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, কমিটি বা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে উচ্চতর স্কেলে পদোন্নতি দিতে হবে। বিভাগীয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে নির্ধারিত কোটার মধ্যে তা সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।

কোনো কারণে কোটার বাইরে অতিরিক্ত পদোন্নতি দেওয়া হলে ওই পদোন্নতিপ্রাপ্তদের জ্যেষ্ঠতা পদোন্নতির তারিখ থেকে গণনা করা যাবে না।

কোনো পদে উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হলে কমিটি বা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে যোগদানের তারিখ থেকেই ওই পদে তার জ্যেষ্ঠতা গণনা করা যাবে।

বিভাগীয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে কমিটি বা কমিশন আগে যাদের পদোন্নতির সুপারিশ করবে, তারা পরে সুপারিশপ্রাপ্তদের চেয়ে জ্যেষ্ঠতা পাবেন। একই ব্যাচের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতির সুপারিশ করা হলে তাদের পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা বয়সের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে।

পদোন্নতি না নিলেই অসদাচরণ

খসড়া বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো—কোনো কর্মচারী পদোন্নতির জন্য যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও পদোন্নতি নিতে না চাইলে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে।

সরকারি চাকরি আইনে অসদাচরণের জন্য লঘু ও গুরুদণ্ডের বিধান রয়েছে। লঘুদণ্ডের মধ্যে রয়েছে তিরস্কার, পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিতকরণ এবং মূল বেতনস্কেলের নিম্নতর কোনো ধাপে অবনমিতকরণ। আর গুরুদণ্ডের মধ্যে রয়েছে নিম্নপদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ, বাধ্যতামূলক অবসর এবং সরকারি চাকরি থেকে অপসারণ।

সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া যুগান্তরকে বলেন, নতুন বিধিমালায় জটিলতা বাড়তে পারে। যথাযথভাবে বিধিমালা প্রণয়ন করা না হলে সরকার মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়তে পারে। তার মতে, আগের বিধিমালা সংশোধন না করে নতুন করে বিধিমালা প্রণয়ন করা হলে আরও জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের একটি অংশ বিশেষ করে ঢাকায় কর্মরতরা সহকারী সচিব পদে পদোন্নতি নিতে অনাগ্রহী—এমন বিষয়ও খসড়ায় গুরুত্ব পেয়েছে। পদোন্নতি নিলে ঢাকার বাইরে বদলি হওয়ার আশঙ্কায় অনেকে বর্তমান পদেই থাকতে চান। এ ধরনের প্রবণতা বন্ধ করতেই পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনের পরও পদোন্নতি না নেওয়াকে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করার বিধান রাখা হচ্ছে।

Follow করুন এমটিনিউজ২৪ গুগল নিউজ, টুইটার , ফেসবুক এবং সাবস্ক্রাইব করুন এমটিনিউজ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে